,
২২.৯৬ °সে

ধর্মচিন্তা


ইসলামে আত্মীয়ের অধিকার।

ফাইল ছবি

ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্ক সর্বতোভাবে জড়িত। আত্মীয় ছাড়া এ জীবন অচল। আত্মীয়দের সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা নিয়েই মানুষ এ পার্থিব জীবনে বেঁচে থাকে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় না থাকলে জীবন হয়ে যায় নিরস, আনন্দহীন, একাকী ও বিচ্ছিন্ন। তাই পার্থিব জীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
আত্মীয়র পরিচয় : ‘আত্মীয়’ শব্দের অর্থ হচ্ছে স্বজন, জ্ঞাতি, কুটুম্ব। ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Relationship. এর সংজ্ঞায় Oxford অভিধানে বলা হয়েছে, The way in which two people, groups or countries behave towards each other or deal with each other.
‘তায়িবুল কালাম ফি ছিলাতির রিহমে’ গ্রন্থের গ্রন্থাকার আবু ইউসুফ মুহাম্মদ যায়েদ বলেন, ‘আত্মীয় হচ্ছে তারা যাদের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্ক আছে, তারা সম্পদের উত্তরাধিকারী হোক বা না হোক, মাহরাম হোক বা না হোক’।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার তাৎপর্য : এর অর্থ ও তাৎপর্য হচ্ছে, স্বজন ও আপনজনের সার্বিক খোঁজখবর রাখা ও তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা। ইবনুল আছির বলেন, ‘এটা হচ্ছে বংশীয় ও বৈবাহিক সম্পর্কীয় আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ-অনুকম্পা প্রদর্শন করা, তাদের প্রতি সদয় ও সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখা, যদিও তারা দূরে চলে যায় এবং খারাপ আচরণ করে’। আত্মীয়ের হক আদায়ে সচেতন হওয়ার ব্যাপারে সচেতন করে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ভয় করো রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে, তাদের হক আদায় করে দাও।’ (সূরা নিসা : ১)
আত্মীয়তার প্রকার : আত্মীয় প্রধানত দুই প্রকার। ১. রক্ত সম্পর্কীয় বা বংশীয়। যেমনÑ বাবা-মা, দাদা-দাদী, ভাই-বোন, মামা-খালা, চাচা, ফুফু প্রমুখ।
২. বিবাহ সম্পর্কীয়। যেমনÑ শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা প্রমুখ।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার হুকুম : আত্মীয়দের ভিন্নতার কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার হুকুম ফরজ, সুন্নত ও মানদুব বা বৈধ হয়ে থাকে।
ফরজ : বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা ফরজ। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার বাবা-মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।’ (সূরা আনকাবুত : ৮)
বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে হাদিসে অনেক নির্দেশ এসেছে। যেমনÑ রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক, যে ব্যক্তি তার বাবা-মা উভয়কে কিংবা একজনকে বার্ধক্যাবস্থায় পেল এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করল না।’ (মুসলিম)
সুন্নত : অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘রেহেম (আত্মীয়তার সম্বন্ধ) আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে। সে বলে, যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক রাখবেন। আর যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন।’ (মুসলিম)
মানদুব বা বৈধ : অমুসলিম বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সুসম্পর্ক বজায় রাখা বৈধ। যেমন আল্লাহ বলেনÑ ‘আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে।’ (সূরা লুকমান : ১৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার পদ্ধতি ও উপায় : আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কিছু কাজ করা জরুরি। সেগুলো হচ্ছেÑ তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা, তাদের অবস্থা সম্পর্কে লক্ষ রাখা এবং তাদের খোঁজখবর নেয়া। তাদের উপহার-উপঢৌকন দেয়া, তাদের যথাযথ সম্মান করা ও মর্যাদা দেয়া। তাদের মধ্যে যারা দরিদ্র তাদের দান করা। তাদের সুসংবাদে শরিক হওয়া এবং দুঃসংবাদে সহমর্মী ও সমব্যথী হওয়া। এককথায়, সম্পর্কোন্নয়ন ও মজবুতকরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখা।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব : আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা অতি জরুরি। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেনÑ ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো বাবা-মায়ের সাথে, নিকটাত্মীয়ের সাথে, ইয়াতিম, মিসকিন, নিকটাত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী...।’ (সূরা আন-নিসা : ৩৬)
মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেনÑ ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং সদাচার করবে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনের সাথে।’ (সূরা বাকারা : ৮৩)
আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ ‘আমি রাসূলুল্লাহ সা:কে বলতে শুনেছি, ‘যে লোক রিজিক প্রশস্ত ও আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।’ (বুখারি)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ও এর মাহাত্ম্য : আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা, বিপদাপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের ভালো-মন্দের খোঁজখবর রাখা এবং তাদের সার্বিক কল্যাণ কামনা করার ফজিলত সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে এবং হাদিসে অনেক বাণী উল্লিখিত হয়েছে। মহান আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যারা তা অটুট রাখে তাদের প্রশংসায় তিনি ইরশাদ করেনÑ
‘আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণœœ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যারা তা অক্ষণœœ রাখে, ভয় করে তাদের প্রতিপালককে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে...এদের জন্য শুভ পরিণাম।’ (সূরা রা’দ : ২১)
আবু সুফিয়ান রা: ইসলাম গ্রহণের আগে বাণিজ্য সফরে শ্যাম দেশে গেলে বাদশা হেরাকল তার কাছে রাসূলুল্লাহ সা:-এর বিবরণ জানতে চান। জবাবে তিনি বলেনÑ ‘তিনি আমাদের আল্লাহর ইবাদত, সালাত, সত্যবাদিতা, চারিত্রিক শুভ্রতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজার রাখার আদেশ করেন।’ (বুখারি)
আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখার ফজিলত : যেকোনো অবস্থায় আত্মীয়তার সম্পর্ক যারা অক্ষুণœ রাখেন, তাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা: বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি, মুসলিম)
ইসলাম শুধু স্বধর্মীয় আত্মীয়দের সাথেই সম্পর্ক রক্ষায় উৎসাহিত করেনি, বরং আত্মীয় অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আসমা বিনতে আবু বকর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ ‘রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবদ্দশায় আমার মা মুশরিক থাকতে একবার আমার কাছে আগমন করেন। আমি রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি আমার সাথে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী, আমি কি আমার মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখব? তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, তুমি স্বীয় মায়ের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখো।’ (মুসলিম)
অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যাওয়া ও সেবা করা : আত্মীয় কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া এবং সাধ্যানুযায়ী সেবা করা উচিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেনÑ ‘কোনো মুসলিম যখন তার কোনো রুগ্ন মুসলমান ভাইকে দেখতে যায়, তখন সে যেন জান্নাতের বাগানে ফল আহরণ করতে থাকে, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে।’ (মুসলিম)
আত্মীয়র দুঃখ-শোকে সান্ত্বনা দেয়া : আত্মীয়র যেকোনো দুঃখ-শোকে তার পাশে দাঁড়ানো, তার প্রতি সমবেদনা জানানো এবং তাকে সান্ত্বনা দেয়া নেকির কাজ। রাসূলুল্লাহ সা: বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি তার মুমিন ভাইকে বিপদে সান্ত্বনা দেবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন।’ (ইবনু মাজাহ)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণতি : আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা শুধু একটি মারাত্মক অপরাধই নয়, রবং একটি সামাজিক, মানবিক ও আত্মিক ব্যাধি, যা একটি সুস্থ সমাজ, সুন্দর পরিবেশ ও মানবতাবোধকে হত্যা করে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধকে ব্যাহত করে। ফলে ইসলাম আত্মীয়তার বন্ধনকে অটুট রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে এবং যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করে, তাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি এবং কঠিন আজাব ও শাস্তির কথা ঘোষণা করেছে, তীব্র ভাষায় তাদের ভর্ৎসনা করে মহান আল্লাহ বলেনÑ ‘যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে আশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে লানত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস।’ (সূরা রা’দ : ২৫)
আমাদের অনেকেই সাধারণ বিষয় নিয়েও ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের সাথে দীর্ঘ দিন কথাবার্তা বন্ধ রাখে। এমনকি অনেকে এভাবে রাগ করে সারা জীবন দেখা-সাক্ষাৎ, কথাবার্তা বন্ধ রাখে। অথচ শরয়ি কারণ ছাড়া আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেনÑ ‘কোনো মুসলমানের জন্য তিন দিনের বেশি তার ভাইয়ের সাথে কথা বন্ধ রাখা বৈধ নেই।’ (মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সা: অন্যত্র ইরশাদ করেনÑ ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম)
আত্মীয়ের জানাজায় অংশগ্রহণ : আত্মীয়ের মধ্যে কেউ ইন্তেকাল করলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করা নৈতিক দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা: বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি ইমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় কোনো মুসলমানের জানাজায় আসে এবং তার জানাজার সালাত আদায় ও দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সাথে থাকে, সে দুই ক্বিরাত সওয়াব নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে।’ (বুখারি)
শেষ কথা : ইসলাম আত্মীয়ের প্রতি যে অধিকার দিয়েছে তা যথাযথভাবে আদায় করা হলে শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। সবার উচিত আত্মীয়ের হক আদায় করা।
মোঃ আতিকুর রহমান। 

   লেখক : গবেষক

May: Ousting Me Won't Help

Resize the browser window to see.

KFC - Killing Fabulous Chickens
Total time 45:12
Cinque
May: Ousting Me Won't Help
UK POLICIES

মন্তব্যসমূহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শিরোনাম